সাহিত্য সাহিত্যিক ও তাঁর সৃষ্টি

শিল্প-সাহিত্য

কামরান চৌধুরী: সাহিত্য হচ্ছে বিশেষভাবে লিখিত এমন বিষয়বস্তু যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায়। ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। সাহিত্য হলো মানব বা সমাজ জীবনের দর্পন। একটা সময়ে তখনকার সমাজের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে সাহিত্যের মাঝে। সাহিত্যে মানব মনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রাগ-অভিমান প্রভৃতি মানব জীবনের চিরন্তন নানা অনুভূতির প্রতিফলন ঘটে। জীবন প্রবাহের বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতাকে মন্থন করে বিশেষ সৃজনে সৃষ্ট বিষযগুলোই সাহিত্য পদবাচ্য।

‘সাহিত্য’ শব্দটির সৃষ্টি বাংলা শব্দ ‘সহিত’ থেকে। ‘সহিত’ শব্দমূলের সঙ্গে ‘য’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সাহিত্য’ শব্দটি গঠিত। ‘সহিত’ অর্থ-সংযুক্ত, সমন্বিত, সঙ্গে, মিলন, যোগ, সংযোগ, সাথে বা সম্মিলন। ‘সাহিত্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ-সহিতের ভাব, মিলন বা যোগ; অথবা-জ্ঞানগর্ভ বা শিক্ষামূলক গ্রন্থ; আবার-কাব্য-উপন্যাসাদি রসাত্মক বা রম্য রচনা, যাতে এক হৃদয়ের সঙ্গে অপর হৃদয়ের মিলন ঘটে। লেখক ভাষার মায়াজাল বিস্তারের মাধ্যমে সহৃদয় হৃদয়সংবেদী পাঠকের সঙ্গে লেখক বা সাহিত্যে বর্ণিত নর-নারীর সুখ-দুঃখময় জীবনের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে থাকেন বলেই ‘সাহিত্যে’র অনুরূপ নামকরণ হয়েছে। ‘নিজের বা পরের কথা অথবা বাহ্য-জগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয়, তার শিল্পসংগত প্রকাশই সাহিত্য।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন- “অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষায়, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।”সাহিত্যের পরিধি ব্যাপক। স্রষ্টার বাণী, মনীষী ও মহামানবদের কল্যাণমূখী সকল বাণীই সাহিত্য পর্যায়ভূক্ত।

ধরণ অনুযায়ী সাহিত্যকে কল্পকাহিনি, বাস্তবকাহিনি কিংবা পদ্য, গদ্য এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। সাহিত্যের আদি শব্দশিল্প কবিতা। সভ্যতার ক্রম বিবর্তনের ফলে মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন, জীবন উপভোগ ও মনের সূক্ষ্মতর ভাব, অনুভূতি, অভিজ্ঞতাকে শিল্পময় করে মননশীলভাবে প্রকাশের প্রয়োজনে কবিতার পর বিভিন্ন সাহিত্য-আঙ্গিকের সৃষ্টি হয়েছে- নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভ্রমণ সাহিত্য ও রম্য-রচনার মতো নানা রকমের সাহিত্যের শাখা। সাহিত্য সৃষ্টির এ প্রয়াস চলমান। রুচিশীল, প্রকৃত ও জীবন-অভিজ্ঞতালব্ধ সুসাহিত্য সৃষ্টির ধারা বিকাশই আমাদের কাম্য। অপসাহিত্য, বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক সাহিত্য রচনার অপপ্রয়াস থেকে সাহিত্যকে রক্ষা করতে হবে। সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের আত্মা বা চিত্তের খোরাকটি রক্ষিত হবে।

প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে সাহিত্যের ভাব বিদ্যমান থাকে। সেই ভাবই হলো সাহিত্য। কেউ মনের ভাবকে সাহিত্যের ছন্দময় শব্দে, নান্দনিক ভাষা, শিল্পীগুণে ও মধুময় ভাষায় প্রকাশ করেন, আবার কেউ মনোমুগ্ধকর ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। যারা প্রকাশ করতে পারেন তারাই কবি, সাহিত্যিক, রচনাশিল্পী। সাহিত্যিকরা মেধা খাটিয়ে চমকপ্রদ শব্দ ও ছন্দের মাধ্যমে অর্থবহ বাক্যে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস ইত্যাদি উপস্থাপন করে। তাদের জ্ঞানের কথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে যায়।
সাহিত্যিকেরা তাদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাসের মাধ্যমে জীবন ও সামাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। শিল্পী যেমন তুলির ছোঁয়ায় দেশ ও জাতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন, তেমনিভাবে একজন সাহিত্যকর্মী সাহিত্যের ভাষায় একটি সাধারণ বিষয়কে সাহিত্য রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। সেই সাহিত্যই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যিকেরা তাদের লেখার মাঝে তুলে ধরেন জাতীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি, শালিনতা, সেবা, আনুগত্য, ধর্ম-অধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি। প্রবন্ধের মধ্যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ রাষ্ট্রের কল্যাণ-অকল্যাণ তুলে ধরেন। যা দেশ ও জাতিকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে। দেশের উন্নতি ও সফলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।

সাহিত্যের সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক। সাহিত্য মুছে দেয় জীবনের বিষন্নতাকে। সাহিত্যের মাঝে মানুষের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, ব্যথা-বেদনা, মান-অভিমান, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। সাহিত্যিকেরা ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, মানবতাবোধ এবং রীতি প্রথা, হৃদয়ের আর্তনাদ তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তারা মনের উৎকর্ষ সাধন করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পথ পেরিয়ে সম্ভবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

সাহিত্যের জন্ম মানুষের ভাষা থেকে। ভাষা হলো জীবনের ব্যাকরণ। সবার আগে ব্যাকরণকে জীবন্ত করতে হবে। পাশাপাশি রচনা করতে হবে নীতিমালা। নীতিমালার মাধ্যমে পূরণ হবে মনের ক্ষুধা। সাহিত্যিকের অন্তর্নিহিত বুদ্ধি-জ্ঞান, ছন্দময় বাক্য, সৃজনশীলতা, ভাব ও শব্দচয়ন, প্রয়োগের ক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তির উপস্থাপন, বাক্য নির্বাচনের যোগ্যতা, উপমাসহ সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। একজন সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিক চরিত্র ও নৈতিক অবক্ষয় থাকতে পারে কিন্তু তার সাহিত্য মনুষ্যত্ব ও মানবতাবোধ জাগ্রত করে। সেই জন্যে সাহিত্যিককে পরিত্যাগ করা যায় কিন্তু তার সাহিত্যকে পরিত্যাগ করা যায় না।

সাহিত্যিকেরা সুন্দরের পূজারী। সাহিত্যের বিশেষ কোনো নিয়মকানুন বা রীতিনীতি নেই। নেই কোনো শিক্ষার মানদ-। তবে সাহিত্যিকের বিশেষ কিছু গুণ থাকা দরকার। যেসব গুণ সাহিত্যিককে সুযোগ্য, মর্যাদাশীল, জ্ঞানী এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী করে তুলে। নৈতিকতাবোধ, স্বচ্ছ চিন্তাশক্তি, মানবতাবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের অধিকারে জাগ্রত করে। যে ব্যক্তির মাঝে সৃজনশীল ও সৎ মনুষ্যত্ববোধ, নৈতিকতাবোধ, কল্যাণবোধ, সহনশীলতা, সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত থাকে- তিনিই একজন সাহিত্যিক। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য, রুচিবোধ ও মানসিক চাহিদার যেমন প্রয়োজন, তেমনিভাবে সাহিত্যের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পরিবেশ, রুচিবোধ ও মানসিক চাহিদার যথেষ্ট প্রয়োজন।

সাহিত্যিক তার প্রতিটি রচনায় নিত্যদিনে নতুন বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। সেসব রচনা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে বিরাট প্রভাব পড়ে। সাহিত্যিকেরা নিজস্ব চিন্তা চেতনা দিয়ে সবাইকে গড়ে তুলার চেষ্টা করেন। জ্ঞানীগুণীর জ্ঞানময় কথা, শৌর্যশালী, সুস্থসম্মত বিনোদন সমাজকে সমৃদ্ধশালী করে তুলেন। জ্ঞানীদের মূল্যবান কথা মূল্যায়ন করে, পরিবেশবান্ধব পরিবেশে ফিরে আসার চেষ্টা করে পাঠক সমাজ বা সাধারণ মানুষ।

পাঠক মাত্রই সাহিত্যের মাঝে রসাস্বাদন করতে চাই। আর রসদান করাই সাহিত্য ও সাহিত্যিকের কাজ। মুখের ভাষায় যা প্রকাশ করা যায় না, তা প্রকাশ করতে হয় ছবির মাধ্যমে আর অঙ্কিত ছবিই মূলত সাহিত্য, যা সবার জন্য সৃষ্টি হয়। সাহিত্য জীবন ও জগতকে সুন্দর করে তুলে, তার সত্যকে আমাদের কাছে প্রকাশ করে আনন্দ দান করে। সাহিত্য সুন্দরকে অনুভব করতে শেখায়। মানুষ যখন সুন্দরকে অনুভব করতে পারে তখন সে আনন্দ পায়। সাহিত্য মানুষের চিন্তা ও মানসিক দৃষ্টি প্রসারণের মাধ্যমে সুন্দরকে চেনায়, অনুভব করায়। ভাবতে শেখায় নিজেকে নিয়ে, জীবন নিয়ে, চারপাশের মানুষ ও সমাজকে নিয়ে।
একবিংশ শতাব্দীতে সাহিত্যে প্রয়োজন অনেক বেশি। পৃথিবীতে এখন যান্ত্রিকতা রাজত্ব করছে। মানুষের চাহিদা হয়েছে পার্থিব। শিক্ষা হয়েছে পরীক্ষা নির্ভর। নির্ধারিত কিছু বিষয় মুখস্ত করলে পাস করা যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষকে যন্ত্রমানব তৈরি করছে। সাহিত্য মানুষকে মনুষত্ব্যের বিকাশ ঘটায়। সমাজের বাস্তব অবস্থা যা আমি বা আপনি দেখতে পাইনা সাহিত্যিকগন সেগুলো তাদের দূরদর্শিতার দ্বারা দেখতে পান এবং সেগুলোই লেখার মাধ্যমে সমাজের বাকিদের দেখিয়ে দেন। সাহিত্য সরাসরি সমাজের উপর প্রভাব ফেলে।

লেখক- কামরান চৌধুরী,  পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক,অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *