মশার কাছে লেখা অসাধারণ একটি চিঠি

ফিচার
আমার প্রাণেরপ্রিয় মশা,
 
চিঠির শুরুতে জানতে চাই কেমন আছ? জানি তুমি ভালো আছ। হয়তো ভাবছ, তোমার ভালো থাকার ব্যাপারে আমি এতটা নিশ্চিত হলাম কীভাবে! শুনলে তুমি কিন্তু অবাক হবে না মোটেই। সর্বত্র তোমার এবং তোমার পরিবার-পরিজনের সগর্ব উপস্থিতি সুস্পষ্টভাবেই জানান দিচ্ছে যে তুমি ভালো আছ। এই যে এই মুহূর্তে আমি তোমাকে লিখে চলেছি, এখনো আমাকে ঘিরে রয়েছে তোমার জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা। তোমরা যে শুধু আমাকে সঙ্গ দিয়ে চলেছ তা কিন্তু নয়, বরং তোমরা আমার সেবায়ও নিয়োজিত আছ।ভালোই সেবা কর তোমরা।নোবেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখে তোমার বংশধরেরা। তোমাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে রাতের ঘুম কোথায় হারিয়ে গিয়েছে আমার! তাই তো মন খুলে লিখতে পারছি তোমায়। এই যে বাড়িতে বাড়িতে ছোট্ট শিশুগুলো ঘুমিয়ে আছে, তারাও তোমাদের আদর থেকে বঞ্চিত নয়। আদরের আতিশয্যে ওদের ছোট্ট দেহগুলো তোমরা তুলে নিয়ে গেলেও আমি অবাক হব না মোটেই। ভাবি, কীভাবে তোমরা এতটা পরাক্রমশালী হয়ে উঠলে! কী সেই মন্ত্র! জানার আগ্রহ রয়ে গেল। সুযোগ হলে জানিয়ে দিও চিঠির উত্তরে। অপেক্ষায় রইলাম।
 
যত দূর মনে পড়ে, অষ্টম অথবা নবম শ্রেণিতে বাংলা দ্বিতীয় পত্রে আমাদের মুখস্থ করতে হয়েছিল “মশার উপদ্রব রোধে পৌরসভা চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখার কথা”। তখন এখনকার মতো সৃজনশীল প্রশ্নের চল ছিল না। মুখস্থ করেছিলাম, তুমি নাকি ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গুর মতো রোগ ছড়াও। এখনকার ছেলেমেয়েরা তোমাকে নিয়ে এই চিঠি সৃজনশীল পদ্ধতিতে লেখে কি না জানি না। যদি লেখে, আমি নিশ্চিত, তারা এই তালিকায় চিকুনগুনিয়া, জিকা নামটি সংযোজন করে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। তাই তুমি আশ্বস্ত থাকতে পারো, ওরা তোমাকে অবমূল্যায়ন করেনি। বাস্তব জীবনে পৌরসভার চেয়ারম্যান মহোদয়কে তোমাকে নিয়ে কখনো সে চিঠি লেখা হয়ে ওঠেনি। ভাগ্যিস লিখিনি! যদি লিখতাম আর দৈবক্রমে তিনি তোমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে আজ হয়তো তোমার এই স্বর্ণযুগের উদয়ে কিছুটা হলেও বাধার সৃষ্টি হতো।
 
কদিন ধরেই দিনে-রাতে তোমার নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গলাভে আপ্লুত হয়ে আছি। গতকাল যখন খানিকটা দমকা হাওয়া বইছিল, তখন তোমার জন্য রীতিমতো দুশ্চিন্তা¯হয়েছিল আমার। ভাবছিলাম, তুমি ভালো আছো তো! তোমার কোনো ক্ষতি হবে না তো! কারণ, এই প্রাকৃতিক শক্তিই এখন তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু, আমি জানি। ভাবতে ভালো লাগে, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশন কর্তৃক ছিটানো ওষুধের শক্তিকে তুমি পরাজিত করেছ। তোমাকে ঘায়েল করার জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক প্রচণ্ড শব্দে বিষ ছিটানো হয়। সে শব্দে আমাদের শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু কী আশ্চর্য! তোমার ওপর সেসব কোনো প্রভাব ফেলে না! কথায় বলে, ‘যত গর্জে তত বর্ষে না!’ এই প্রবাদের বাস্তব প্রমাণ দেওয়ার জন্য তোমাকে অভিনন্দিত করব, নাকি সিটি করপোরেশনকে, বুঝে পাই না! তোমার মহাশক্তির কাছে কীটনাশকের কী শোচনীয় পরাজয়! কেউ কেউ তোমার শক্তির প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে বলেন, ‘দ্রবণে নাকি ভেজাল আছে!’ তুমি কিন্তু এসব কথা মোটেই কানে তুলবে না। কারণ, নিন্দুকেরা নানা কথাই বলে থাকে। কয়েক বছর বার কয়েক মশা মারার সেই কামান দাগানোর শব্দ শুনেছিলাম। তবে তা কতখানি প্রভাব ফেলেছিল তোমার ওপর, মনে করতে পারি না। তবে মনে পড়ে, এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। আজ কত দিন সে শব্দ শুনি না; আর মনে হয় শুনবও না হয়তো কখনো। ঢাকা উত্তরের নগরপিতা আনিসুল হক আর আমাদের মাঝে নেই। তাই কি মশা নিধনের শব্দও নেই! মানুষ চিরতরে হারিয়ে গেলে বুঝি এমনই হয়! কিন্তু তোমার জন্য এটা কিন্তু শাপে বর হয়েছে। তা নিশ্চয় তুমি জানো।
 
কর্মস্থলে যাওয়ার সময় একজনকে বলতে শোনলাম রাতে বয়ে যাওয়া দমকা হাওয়া প্রসঙ্গে বললেন, এই ঝোড়ো হাওয়ায় তোমার নাকি ক্ষতি হবে! আঁতকে উঠলাম আমি। প্রতীক্ষায় রইলাম সন্ধ্যায় তোমার আগমনের পথ চেয়ে। অভিনন্দন তোমাকে। কারণ, তুমি আমাকে নিরাশ করোনি। কর্মস্থল থেকে বের হয়ে সন্ধায় রাস্তায় নামতেই মাথার ওপর চক্রাকারে তোমরা আমাকে গার্ড অব অনার জানালে। পাশের মানুষগুলো ও বাদ যাননি। তাদের মাথার ওপর লক্ষ করলাম ত্রিভুজাকৃতিতে তোমরা তাদেরকে অভিবাদন জানাচ্ছ। শিশুরা আকার-আকৃতির ধারণা যে তোমাদের কাছ থেকে লাভ করতে পারে, কেউ কি কখনো তোমাকে তা বলেছে? তোমাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় যে তোমাদের ধন্যবাদ দেব, সে সাহসও হলো না। মুখ খুললেই যদি তোমরা কেউ একবার মুখে ঢুকে পড়ো, তবে তা হতে পারে তোমাদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জেনেশুনে আমি তোমাদের এই ক্ষতি করি কী করে! বেরসিক উবার ড্রাইভার তাগাদা দিল তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা বন্ধ করতে। ধারণা করে নিলাম, সে হয়তো তোমাদের বিনা পয়সায় পরিবহন সেবা দিতে আগ্রহী নয়। কিন্তু সে হয়তো জানে না,ঢাকা শহরে তার উবার গাড়ির গতির চেয়ে অনেক বেশি গতিতে চলার ক্ষমতা তোমার রয়েছে। তাই তুমি নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারো। এক জায়গা থেকে দূরবর্তী আরেক জায়গায় যেতে তুমি একাই এক শ। উচ্চতাও আজকাল তোমার জন্য তেমন কোনো বড় বাধা বলে মনে হয় না।
 
তাই বলবো, মশা তুমি এগিয়ে চলো দ্বিগুণ শক্তিতে। জানি, তুমি নির্ভীক, তুমি সাহসী, লড়াকু, তুমি আত্মবিশ্বাসী.তোমার মনে কোন ভয় নেই। তুমি মহাপরাক্রমশালী, তুমি অনন্য, অসাধারণ। তোমার অভিযোজন ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তাই তোমার জয় হোক। জয় হোক তোমার এই মহাপরাক্রমশালী হওয়ার পেছনে যারা ভূমিকা রেখেছে, তাদের প্রত্যেকের। পরিশেষে তোমার ও তোমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুখীও সমৃদ্ধিশালী জীবন কামনা করছি।
 
প্রাণপ্রিয় মশা, তোমার কাছে আমরা হার মেনেছি। কারণ, এই শহরে তোমার অধিকার রক্ষায় নগরপিতারা যতটা সক্রিয়, মানুষের শান্তির ব্যাপারে তাঁরা ততটাই বেখবর।
লেখক: মামুনূর রশিদ, বার্তাসম্পাদক, নিউজ সমাহার

1 thought on “মশার কাছে লেখা অসাধারণ একটি চিঠি

  1. বেশ মজার একটি বিষয় নিয়ে লেখক লেখার কথা
    ভেবেছে। সত্যি ওদের কাছে আমরা পরাস্ত। কোন কিছুতেই ওদের জব্দ করা সম্ভব হয়না। সুন্দর এবং একটি অদ্ভুত চিন্তা ভাবনাকে অভিনন্দন জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *