বর্ণবাদ বিরোধী নয় সার্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলন হোক

মতামত

নুরুল ইসলাম তিতুমীর: শ্বেতাঙ্গ বা ইংরেজরা কালে কালে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করে আসছে। ইংরেজ বা ইউরোপীয়দের উত্থানের বিকাশের সাড়ে পাচশত বছরের সবখানেই তাদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছে অশেতাঙ্গরা। সম্পদ আহরন ও লুটপাট ই এর মূল কারন। আজকের আমেরিকান শেতাঙ্গরা ইউরোপীয় শেতাঙ্গ বা ইংরেজদের মূল উত্তরসুরী। সুতরাং এ নির্যাতনের ইতিবৃত্ত এক নজরে দেখে নেয়া যাক।

ইউরোপীয়ানদের কাছে তথ্য ছিল ভারতবর্ষ সম্পদে পরিপূর্ণ এক দেশ। আরব মুসলিম বনিকদের মাধ্যমে তারা এ তথ্য পায় কিন্ত এখানে আসরা পথ তাদের জানা ছিল না। পূর্তগীজ ও স্পেনীয় নাবিকদের সমুদ্র অভিযানের সব চেষ্টা আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনে ব্যর্থ হতে থাকে। ১২৩৬ সালে ইউরোাপের স্পেনে কুটকৌশলের মাধ্যমে মুসলমানদের হত্যা করা হয়। পরবর্তী দুইশ বছর ধরে চিরুনি অভিযান দিয়ে মুসলমানদের উপর নিগ্রহ নির্যাতন চলে।ইউরোপের আধুনিক সভ্যতার নির্মাণ জ্ঞান চর্চার ব্যাপক প্রচলন ঘটে মুসলমানদের হাতে। খৃষ্টীয় ক্রুসেডে মুসলমানরা প্রায় বিলীন। ফলে জ্ঞানীবিজ্ঞানী,দার্শনিক, ভুগোলবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী,গণিতবিদ, চিকিৎসাবিদ এমনকি ভাষাবিদ পর্যন্ত তারা হারায়।সভ্যতার লালনকারী মুসলমানদেরকে ক্রুসেডের মাধ্যমে নির্মূল করে ইউরোপীয়রা শুন্য হয়ে পড়ে।

এরূপ অবস্থায় ১৫ শ শতাব্দীর পুরো সময় তারা নতুন ভূখন্ডের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৪৯২ সালে ইটাকিয়ান নাবিক কলম্বাস ইবনে জারিন বা ইউরোপীয়দের মতে বেনজিন পরিবারকে নিয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেন।যদিও এর পূর্বেই আরব বনিকেরা আমেরিকা এসেছিল। ইংরেজ ইতিহাসবিদেরা তা স্বীকার করে না। যাহোক তিনি ( কলম্বাস) ভারতে আসতে গিয়ে ভুল বশত আমেরিকা আবিষ্কার করেন।তিনি এখানে ২৭ হাজার বছর যাবত বসবাসরত একদল আদিবাসীর সন্ধান পান। তাদের নাম দেন ” রেড ইন্ডিয়ান”। কলম্বাস দুই দফায় তাদের ৩০৬ জনকে বন্দী করে ইউরোপে নিয়ে আসে।লক্ষ্য করুন, অভিযানের শুরুতেই সংঘর্ষ,সহিংসতা,বাস্তুহারা করার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার লংঘন শুরু হয়। তারপর কত ঘটনা ঘটল ইতিহাসের পাতায় তা দেখে নিন।সেই আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের মারতে মারতে এখন তাদের অস্তিত্ব প্রায় শুন্যের কোটায়। মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.০০৫ শতাংশ। মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর নৃগোষ্ঠীর এই রেড ইন্ডিয়ানরা এই আমেরিকায় ২৭ হাজার বছর যাবত বাস করে। বলে রাখা ভালো, জীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় সাইবেরিয়া থেকে বরফের উপর দিয়ে হেটে অজানা ভূখন্ডে তারা চলে আসে।পরবর্তীতে প্রাকৃতিকভাবে বরফ গলে যায়, অস্তিত্ব দেখা দেয় বিশাল বেরিয়ার সমুদ্র, আটলান্টিক মহাসাগর। ফলে তাদের আর ফিরে আসা হলো না। পথ তৈরি। পাল তোলা জাহাজ যায়। জাহাজে খালাশি লাগে,লাগে নানা কাজের লোক। আটলান্টিকের ঐপারের ভূখন্ড থেকে সম্পদ আহরন,কৃষি উৎপাদন, বাধা বিপত্তি রুখতে প্রয়োজন লোকের।

বৃটিশ ইংরেজরা শুরু করল আফ্রিকার কালো মানুষদেরকে বলপূর্বক অপহরন করে। ওঠিয়ে নিয়ে যায় সমুদ্রের ওপারের দেশে। কেউ আর ফিরে না। এই কালো মানুষের হয়ে গেল কৃতদাস। কতজন, কত পরিবার,কত দিন, কত বছর,কত হাহাকার আর আর্তনাদ মিলিয়েছে অনন্তকালের বাতাসে। জাহাজ ভরে নিগ্রোদের নিত,ফেরার পথে ঐ জাহাজ লুটপাটের সম্পদে পরিপূর্ণ থাকত। কী করুন আর্তনাদ, কী ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘন। তারা ত আজকের জর্জ ফ্রয়েডের পূর্বসূরি। কলম্বাসের অভিযানের মাত্র ৬৬ বছরের মাথায় ১৫৫৮ সালে বৃটেন ” মুসকভি” নামে কোম্পানি বানিজ্য শুরু করে।যেমনটি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে ভারত বর্ষে ব্যবসা শুরু করে। শিল্প উৎপাদন, বিপনন সহ নানা কাজে আরো শ্রমিক প্রয়োজন। অতএব নিরপরাধ আফ্রিকার কালো মানুষগুলোকে আরো ব্যাপক হারে অপহরন করে আমেরিকায় আনা হয়।১৭৭৬ সালে ৪ঠা জুলাই বৃটিশ আমেরিকান জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। তিনি তখন বৃটিশ সেনাপতি হিসেবে কর্মরত। নানা রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর বৃটিশ পন্থীরা পরজিত হয়। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে বৃটেন আমেরিকার স্বাধীনতা মেনে নেয়।

নামহীন ভূখন্ড এখন একটি আনুষ্ঠানিক স্বাধীন রাষ্ট্র। ততক্ষণে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অবস্থান মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। যাদের শ্রমে ঘামে ভিজে আছে আমেরিকার স্বাধীনতা ও উন্নতি , তারা তখনো কৃতদাস।হায়রে মানবতা। ১৮৬১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কৃতদাস প্রথা বাতিল করেন। কিন্তু মুক্তি আজো উপেক্ষিত। উগ্রবাদী শেতাঙ্গরা আজো মারে, কারনে অকারণে ঝরে যায় নিষ্পাপ প্রাণ। মৃত্যু হয় জর্জ ফ্লয়েডদের। আমেরিকা হাতছাড়া হওয়ার পর বৃটেন এবং ইউরোপীয়দের অর্থনীতিতে সংকট মারাত্মক রুপ নেয়। ইতিমধ্যেই পূর্তগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা ভারতের আসার সমুদ্র পথ আবিষ্কার করেন। পূর্তগীজ, ডাচ এবং ফরাসীরা সেই পথে এসে ভারতে ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে। বৃটিশরা এবার ভারত বর্ষে পা দিল। প্রথমে দিল্লির বাদশা থেকে সুকৌশলে ব্যবসা করা অনুমতি নেয়।ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে বানিজ্য শুরু, কুঠি স্থাপন এবং ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে প্রহসনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন নবার সিরাজুদ্দৌলাকে পরাজিত করে বাংলা দখলে নেয়। এরপর ইংরেজরা খুব অল্প সময়েই ভারতীয় উপমহাদেশ দখল করে। পৌনে দুইশত বছর শাসনামলে তারা এখানকার সব সম্পদ লুট করে পৃথিবীর ভূস্বর্গ্ব খ্যাত এই উপমহাদেশকে মহাশ্মশান আর দুর্ভিক্ষের দেশে পরিনত করে।

শিক্ষা, সংস্কৃতি, নিজস্ব রীতিনীতি সব ধবংশ করে।কত? কত মানুষ আন্দোলন, সংগ্রামে, নিপীড়ন নির্যাতনে, নির্বিবাদে প্রাণ হারালো? এখানেও কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদ মিশে আছে অনন্তকালের বাতাসে। বৃটিশরা সবখানে প্রথমে বানিজ্য পরে চক্রান্তের মাধ্যমে দেশ দখলে নিয়েছে। ফলে আধুনিক শিল্প বিপ্লব সেই ইউরোপে, বৃটেন ঘটেছে। সেই থেকে সারা পৃথিবীর টাকা ঐ শেতাঙ্গ ইংরেজদের হাতে। তার নাম ডলার কিংবা পাউন্ড। এই ডলার পাউন্ডের খেলায় পৃথিবীতে আর মানবাধিকার ফিরে পায় নি। ১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। পাল্টে গেল পৃথিবী। জাতীয়তাবাদী চেতনায় বৃটিশরা রাজ্যা হারা হয়। নতুন নতুন রাষ্ট্রের জম্ম হয়। এবার বৃটিশের সহোদর আমেরিকার খেলা শুরু।জাতি রাষ্ট্রগুলোর সাথে নানা জোট, নানা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। নানা নামে নানা ঝুজু তৈরি হয়। সহযোগিতা আর দারিদ্রতা দূর করার নাটকীয় মহাপ্লাবন শুরু। দরিদ্ররা স্বাবলম্বী হলো না। কথার মারপ্যাচে কয়েক গুণ উসুল আদায় করে নিল এবং নিচ্ছে। এন জি ও তাদের প্রেসক্রিপশন কিন্ত তাদের দেশে নেই। বিনিময় মূল্যে ডলার হয়ে পড়ে অপ্রতিরোধ্য মুদ্রা। একপেশে অস্ত্র দানবের মত তারা তৈরি করে তারা নিজেদেরকে মহা শক্তিশালী হিসেবে ঘোষণা করে। লর্ড ক্লাইড যেমন মীরজাফরকে দালাল বানিয়ে বাংলা দখল করে।

ঠিক তেমনি ভাবে তথাকথিত চুক্তির আড়ালে আমেরিকা ইউরোপ পৃথিবীর সব প্রান্তে দালাল বানিয়ে সম্পদ লুটেপুটে নিয়ে যায়। দালান বেঁকে বসলে আগ্রাসন শুরু। যেমনটি ১৯৯১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসন যা এখনো চলমান। লন্ড ভন্ড করা হলো ইরাক, সিরিয়া,মিশর,লিবিয়া, ইয়ামেন আফগানিস্তান, পাকিস্তান। ইরানের সঙ্গে ঝগড়া একটি কৌশলগত খেলা মাত। সৌদির টাকা এমনিতেই তারা পায়। এসব দেশে কত জর্জ ফ্রয়েডের মৃত্যু হলো। কত সীমাহীন আকুতি আর্তচিৎকারে হারালো কত মানুষ। কী বিপন্ন জীবন সেখানে।আর ফিলিস্তিন এবং কাশ্মীর তো মানবজীবনের ভশ্মিভূত এক উপত্যকা। নির্যাতনের দন্ড ছাড়া এখানে যেন কেউ নেই।মায়ানমারের রাখাইনদের বাস্তুহারা করা, শুধু খনিজ সম্পদগুলো লুটে নেবার জন্যই এই বর্বরতা। অথচ আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের পর গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর সু শাসনের স্বপ্নই দেখেছিল বিপর্যস্ত মানবতা।

সেই আফ্রিকা আজও খাবার পায় না।দুর্ভিক্ষে কংকাল সার মানুষগুলোকে কী দিবে বিশ্ব। তারা এখন কৃতদাস নয় বটে খাদ্য বস্ত্রহীন মানবগোষ্ঠী। জীবনের বাকী চাওয়াগুলো তাদের পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব। যেন কৃতদাস না হওয়ার অপরাধে এই তার যোগ্য প্রাপ্তি । গোটা বিশ্ব সাদাচামড়াওয়ালা বিশ্ব মোড়লদের অপরাজনীতির অনিবার্য শিকার। এখনো আফ্রিকা সহ সারা দুনিয়ায় কত কোটি জর্জ ফ্লয়েড মুক্তির অপেক্ষায় আছে, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাদের আওয়াজটা ওঠানো জরুরি। জরুরি পৃথিবীর সর্বত্র মানবাধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা। আর তা না হলে ফ্লয়েডের মৃত্যু বার বার দেখবে সভ্য পৃথিবী।

আজ যদি সময় এসেই থাকে তবে সার্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলন হোক। সাদা শেতাঙ্গরা চোর। আমার, তোমার, সারা পৃথিবীর সম্পদ ওরা চুরি করেছে,লুট করেছে এবং এখনো করছে । ওদের নিজস্ব বলতে কিছু নেই।সবই আমাদের। সারা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের। জেগে উঠুক মানবতা, জয় হোক মানব বিশ্বের। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *