করোনাকালীন ক্রান্তিলগ্নে কারা খুবই বিপাকে পরবর্তী দুরবস্থা মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ ও আগামী বাংলাদেশে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে

মতামত সম্পাদকীয়

এম এস হাবিবুর রহমান :: করোনার বিষাক্ত ছোবলে নাস্তানাবুদ পুরো বিশ্ব। মানবজাতি সহসাই এ ধকল কাটিয়ে উঠবে তারও নেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়েবেশি মানবেতর জীবন যাপন করছেন মানবজাতি। তথ্য-প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে চরম উৎকর্ষতা অর্জন করেছে বর্তমান বিশ্ব। বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রায় একবিংশ শতাব্দীতে পাতাল থেকে মহাশূন্য পর্যন্ত সর্বত্র সফলভাবে বিচরণ করছেন মানুষ।

অথচ, বর্তমান সেই অত্যাধুনিক এ বিশ্বের সবাই এখন অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বিশ্ব মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তিধর দেশসমূহ যারা সবসময় পারমাণবিক অস্ত্রসহ নানাবিধ মারণাস্ত্র দিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় এবং সন্ত্রাসবাদের ধোঁয়া তুলে একের পর এক দেশ ধ্বংস করে, লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করে, তারাও আজ এ অদৃশ্য প্রতিপক্ষের নিকট অসহায়। সেই অদৃশ্য শক্তি কোন মহাক্ষমতাধর পরাশক্তি নয়। বরং তা হলো একটি ভাইরাস।

এ ভাইরাসের ফলে পুরো বিশ্বব্যবস্থা একপ্রকার অচল হয়ে পড়েছে। থেমে গেছে মানুষের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কর্মব্যস্ততা। চীন, ইউরোপ-আমেরিকার মত সর্বাধুনিক উন্নত রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও এই করোনা মোকাবেলায় চরম হিমশিম খাচ্ছে। মারাত্মক এ ছোঁয়াচে রোগটি কোনও সীমান্ত মানে না, ধর্ম মানে না, মানে না গায়ের চামড়ার রঙ, মানে না ধনী-গরিব এবং শাসক ও শাসিতের পার্থক্য। আমরা এতদিনে পরিষ্কার বুঝতে পারছি, করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট মহামারি আমাদের সবাইকে অসহায় করে দিয়েছে। খুব দুঃখজনক ও আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় আছে নিম্ন ও মধ্যেবিত্ত পরিবারের মানুষ ।

বাংলাদেশে সরাসরি লকডাউন ঘোষণা না দিয়ে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে।  সাধারণ ছুটি ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসক ও গবেষক ড. এম এ হাসান এর মতে, ‘সাধারণ ছুটি শব্দগুলোর মধ্যে দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এটি সাধারণ ছুটি নয় সেটি মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।’ সাধারণ ছুটির কারণে তৈরি পোশাক গার্মেন্টস, মিল-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতি দিনদিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। গরিব-দুঃস্থদের পাশেপাশি দিন আনে দিন খায় এমন দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ও করোনা পরবর্তী সম্ভাব্য দুরবস্থা বা অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় আমাদের দেশে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়।

নিশ্চিত করেই বলা যায়, বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় আসতে চলেছে নানাবিধ পরিবর্তন। যে যে আইনকানুন আগে বলবৎ ছিল সেগুলিতে আসবে অনেক পরিবর্তন। অসম্ভব হবে সম্ভব, আবার অতীতের অবাস্তব অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে বর্তমানের বাস্তবিকতা।

বিশ্বায়নের ইতিহাসকে মানবজাতির ইতিহাসের অবিভাজ্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিচার করলে দেখা যাবে বিশ্বায়ন যেমন পুঁজি, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবাহ, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভাবধারার প্রভূত আদানপ্রদান ঘটিয়ে সমগ্র মানবসমাজের ইতিবাচক অগ্রগমনের সহায়ক হয়েছে, এরই পাশাপাশি অত্যন্ত নেতিবাচক বেশকিছু ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর আমেরিকার আদিবাসীদের একদিকে যুদ্ধ করে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং অন্যদিকে মারাত্মক যৌনরোগসহ নানা ধরনের ছোঁয়াচে রোগ দিয়ে তাদের নির্মূল করা হয়েছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার যদি ইতিহাসের একটি মাইলফলক হয়, তাহলে ইতিহাসের বিপর্যয় কাকে বলা যাবে?

 

ইংরেজ কবি জেমস শার্লি তাঁর একটি কবিতার শিরোনাম দিয়েছিলেন, Death The Leveler. অর্থাৎ মৃত্যু সবাইকে সমান করে দেয়। কারণ মৃত ব্যক্তি যত বড় ধনসম্পদশালীই হোন না কেন, তার সেই সম্পদ চিতায় বা কবরে নিয়ে যেতে পারেন না। অবশ্য মিশরের ফারাওদের কবরে কিছু মূল্যবান সম্পদ পাওয়া গেছে। তারপরও বলা যায় মৃত্যু সামাজিক অসাম্যকে বহন করে। একজন দিনমজুরের মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পায় না। কিন্তু সমাজপতি বা রাজনীতিবিদদের মৃত্যুর খবর পত্রপত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। একইভাবে গুরুত্ব পেতে দেখা যায় নামকরা বিজ্ঞানী ও শিল্পসাহিত্যের মানুষদের। মৃত্যু-পরবর্তী যেসব আচার-অনুষ্ঠান হয় তাতেও গরিব-ধনীর পার্থক্য প্রবলভাবে ধরা পড়ে। জীবন আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই সত্য হল রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রভাতের আলো ফোটার সময়টিও এগিয়ে আসে। আমাদের ঘৃণা, হিংসা, অহংকার, ঈর্ষার লাগামহীন প্রতিযোগিতা নিজেদের কেবল ক্লান্তই করে তুলেছে। সেই ক্লান্তিকেই আমরা বিজয় বলে ধরে নিয়েছি। অস্কার ওয়াইল্ডের দি পিকচার অব ডোরিয়েন গ্রে উপন্যাসের মতো আমাদের স্বপ্নকল্পিত ছবি এত বেশি পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে যে, আমরা তাতে তাকাতে ভয় পাই। পৃথিবী আমাদের থমকে দিয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের মনে হয় নীচের ক্ষেত্রগুলিতে পরিবর্তন দৃশ্যমান, আগামীর গর্ভেই শুধু নয়, বর্তমানেও তা পরিষ্কার।

রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা:বিবিসির নিরাপত্তা সংবাদদাতা গর্ডন করেরা বলছেন, গোয়েন্দারা যত গোপন তথ্যই সরবরাহ করুক না কেন, ক্ষমতার শীর্ষে যারা আছেন তারা এসব তথ্য কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন এবং তা কাজে লাগাচ্ছেন তার ওপরই নির্ভর করে এসব তথ্য শেষপর্যন্ত মানুষের কতটা উপকারে আসবে। যে তথ্য মানুষের চলাচল সীমিত করে এর আরও ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে কাজে লাগবে। সোজা কথায়, স্বাস্থ্য নিরাপত্তার স্বার্থে গোয়েন্দা নজরদারির জন্য দেশগুলোর ওপর ভবিষ্যতে দেশের ভিতরে যেমন, তেমনই বাইরেও আন্তর্জাতিক পরিসরে চাপ বাড়বে। তবে ভবিষ্যতে আসল পরিবর্তন আমরা দেখব আরও জটিল তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে। যেমন একটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনও ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কিনা, তা বুঝতে বা খুঁজতে ব্যবহার করা হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

নতুন ধরনের মোড়কে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটছে, জননেতাদের মাধ্যমে সেটা প্রকাশিত হলেও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করছে তাদের অভিব্যক্তি।সময় এসেছে নতুন করে সমাজ-রাজনৈতিক আলোচনার পরিসর তৈরি ও সেটা জাতীয় সংস্কৃতি হিসাবে গড়ে তোলার। বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় আসতে চলেছে নানাবিধ পরিবর্তন। যেমন:  বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ, কার্ডহীনদের ফুড কুপন বিলি, সরাসরি ভর্তুকির টাকা কিংবা সরকারি সাহায্য জনগণের ব্যাংকের হিসাব খাতায় পাঠানো, সর্বোপরি সকলের ন্যূনতম আয় সুনিশ্চিত করার ভাবনা সেই সকল সিদ্ধান্তের ফল।

রাষ্ট্র পরিচালনে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বহুলাংশে ফেরত এসেছে। সরকার সম্পর্কে জনগণের ধারণা উজ্জ্বল হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকলে ছাড়াও পুলিস-প্রশাসন যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সমন্বয় করে কাজ করে চলেছেন তাতে জনগণের আস্থা তারা জিতে নিতে পেরেছেন অনায়াসে। জনসচেতনতা তৈরি, বিপন্ন রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো, বয়স্কদের সহায়তা, আটক ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের আহার ব্যবস্থাপনা, নিভৃতালয়ের আশ্রিতদের দেখাশোনা করা, ইটভাঁটার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষায় পরামর্শ কিংবা পথে আশ্রিতদের খাবার বিলি, এরকম অগণন ক্ষেত্রে তারা কাজ করে চলেছেন বিনিদ্র শরীর-মন নিয়ে, লোকচক্ষুর সামনে কিংবা আড়ালে। ক’জন আমরা সে খবর রাখি? স্থানীয় প্রশাসন সকলেই একই অভিমুখে একই লক্ষ্য নিয়ে জনগণের সেবায় নিবেদিত।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে সামাজিক কর্মকাণ্ডের বর্ধিত অংশ সেটা আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল সামাজিক কর্মকাণ্ড যেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শাখাপ্রশাখা। বর্তমানে রাজনৈতিক নেতাদের সামাজিক নেতা হিসাবে দেখা যাচ্ছে। জনগণের পাশে থেকে তাদের জীবন-প্রবাহে সাহায্য করা এখন তাদের ধ্যান-জ্ঞান (ব্যতিক্রম তুলে আবার নিয়মকে অপমানিত করবেন না দয়া করে!)। আশা করা যায় স্থানীয় স্তরে অভাব-অভিযোগের মীমাংসায় আগামীতে তারা কালাতিপাত করবেন, পাকিস্তান বা আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ওপর জনগণের আস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর এই অকালে সেটা প্রশ্নাতীত। ১৯১৮-১৯ সালের বিগত মহামারীর সময়ে জন এম বেরি বলেছিলেন, ‘Those in the authority must retain the public trust’ and the way to do that ‘is to distort nothing, to put the best face on nothing, to try to manipulate none.’

কথায় আছে, সমস্যার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার বীজ।ভোটের প্রস্তুতি ও ভোটদান প্রক্রিয়ায় আসতে পারে নানা পরিবর্তন। কে বলতে পারে ই-ভোট অথবা গৃহে থেকে ভোটব্যবস্থার কথা ভাবতে হতে পারে রাষ্ট্রকে।

আন্তর্জাতিক বিশ্ব: করোনার সংক্রমণ ও এর বিশ্বায়নের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে এককেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামোর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে তেমন একটা পাত্তা না দিলেও বর্তমানে আমেরিকায় করোনা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে। তবে আমেরিকার শক্তির অবক্ষয়ের পেছনে বেশ কিছু উপাদান সক্রিয়। এগুলো হচ্ছে চিনের অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থান। আরও রয়েছে পারমাণবিক শক্তির ক্রমবিস্তৃতি, মুক্তবাণিজ্যে অনেক দেশের অনীহা, সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ফলে অনিবার্যভাবে সামরিক খাতে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। এ ছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র যেমন ইউরোপ ও জাপানের শক্তি কমে যাওয়া।

নাগরিক চেতনা: জনমানসে বিজ্ঞানে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যুক্তি ও জ্ঞান মানস-সমাজে তাদের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। ফলত মানুষ বাধ্য হচ্ছেন বিশেষজ্ঞের কথা শুনতে ও বিশ্বাস করতে। সরকার পরিচালনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সেই পরিচালনায় যে আন্তরিক, চিন্তাশীল ও একনিষ্ঠ হতে হয় পরিচালকদের, সেটা পরিষ্কার হয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক ফলাফল অন্য অনেক বিষয় মধ্যের এক বিষয় সেটা মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া এই বোধ জন্ম নিয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি: অনলাইনে পাঠ বিগত কয়েক বছর ধরেই ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর তথ্যের প্রাচুর্যতার কারণে অনলাইন শিক্ষার ব্যাপারটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন যাদের জন্য সময়, অর্থ এবং শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের সব কিছু ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজ থেকে সহজতর হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাসের কারণে অনেক দেশ তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে অনলাইন এডুকেশন চালু করেছে। এটি ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকহারে চালু হতে পারে।

শিক্ষা এখন সর্বজনীন, এখন কোনও নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কোর্স করার জন্য সুদূর পথ পাড়ি দিতে হয় না, বরং ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই সেই শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব। ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ইউনিভার্সিটি অব ফিওনিক্স-এর মাধ্যমে অনলাইন এডুকেশনের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি প্রায় ৩৪ বিলিয়নের ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে অনলাইন এডুকেশনের হাত ধরেই লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন সমস্যা কাটিয়ে এই ক্ষেত্রে সম্ভাবনা এক আকাশ।

অফিসের কাজ ঘরে: বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের বিস্তার বেড়ে চলায় এবার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কর্মীদের ঘরে বসেই কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। যেমন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সার্চ ইঞ্জিন গুগলের ইউরোপিয়ান প্রধান কার্যালয় থেকে প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। গুগলের এমন সিদ্ধান্তের পর বিশ্বব্যাপী পাঁচ হাজার কর্মী নিয়ে কাজ করা মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটার সারা বিশ্বে থাকা নিজেদের কর্মীদের ঘরে বসেই অফিসের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। করোনার কারণে ছুটে চলা মানুষ বন্দি হয়ে পড়েছে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে।

গতানুগতিক জীবনে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন, যা মানুষ নিজের চিন্তার জগতে সীমাবদ্ধ রেখেছিল এত দিন। একসময় স্বপ্ন বলে ভাবা পন্থাগুলো সময়ের হাত বদলে বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঘরে বসে অফিস করলে ১৬.৮ ভাগ বেশি কাজ করতে পারছেন মানুষ। বছরে সামগ্রিকভাবে এ কাজের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে অনেক বেশি। ফলে এখন এটা নিয়ে অনেকেই মনে করছেন বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সিদ্ধান্তে স্থায়ীভাবে চলে আসতে পারে। আবার দেখা গেছে, ঘরে বসে অফিসের কাজ করলে মানুষের জীবনযাত্রাও অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। মানসিক দিক থেকেও অনেকখানি ভাল থাকতে পারবেন। সহভাগী কাজ করার অ্যাপ-এর চাহিদা বাড়বে আগামীতে। টেলি-মেডিসিন ক্ষেত্রের পরিধি বিশ্বব্যাপী বাড়তে চলেছে। জীবনের বহুক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে সেটা অনুমান করা খুব কষ্টসাধ্য নয়।

যন্ত্রমানবের কাজকর্ম বৃদ্ধি:শিল্প-কারখানায় উৎপাদনকাজে ক্রমেই রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। ধীরে ধীরে যন্ত্রের দখলে চলে যাচ্ছে শ্রমবাজার। আর এবার করোনার প্রাদুর্ভাবে আরও প্রকট আকার দেখা দিচ্ছে। কারণ মানবকর্মীর কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কলকারখানা। এদিক থেকে রোবটের কাছে হেরে যাচ্ছে মানুষ। তাই মানব শ্রমিকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে বসেছে। ২০২৫ সালের মধ্যে শ্রমবাজারের ৫২ ভাগই চলে যাবে রোবটের দখলে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল এ খবর জানিয়েছে আরও আগেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে যত মানুষ কর্মরত রয়েছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের অর্ধেকই ছাঁটাইয়ের কবলে পড়বেন। সেই জায়গায় কাজ করবে যন্ত্রচালিত রোবট। আর এ আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত করতে এর পেছনে কাজ করতে পারে করোনার প্রাদুর্ভাবও।

অর্থনীতি: বাড়বে বেকারত্ব:করোনার কারণে পুরো বিশ্বে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক ধস। প্রতিনিয়তই দেশে দেশে বাতিল হচ্ছে কলকারখানার অর্ডার। সবকিছু কবে স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে কেউ কিছু জানেন না। করোনা-পরবর্তী সময়ে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে শুরু করতে পারলেও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে চিরতরে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়বে মানুষ। উৎপাদন না হলে, বিক্রি হবে না। মানে লাভ হবে না। যার অর্থ, কর্মীনিয়োগ হবে না।

ব্যবসাগুলো স্বল্প সময়ের জন্য অনাবশ্যক কর্মীদের ধরে রাখে এ আশায় যে, পরিস্থিতি ফিরে এলে যাতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যায়। কিন্তু পরিস্থিতি বেশি খারাপের দিকে এগোলে তারা আর কর্মীদের ধরে রাখে না। মানুষ চাকরি হারানোর ভয়ে থাকে। ফলে তারা পণ্য কেনেও কম। আর পুরো চক্র নতুন করে শুরু হয়। আমরা এগোতে থাকি অর্থনৈতিক মন্দার দিকে। এখন পুরো বিশ্ব সেদিকেই যাচ্ছে। ফলে রোবট নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে পারে কলকারখানাগুলোয়। করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে যে বেকারত্ব তৈরি হবে, এতে কত লোক যে বেকার হবে সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।

বাড়বে সচেতনতা, কমবে অর্থহীন কাজ:মানুষ নির্দিষ্ট কিছু কাজ করে জীবনধারণ করতে পারে না। তাকে নানা রকম বৈচিত্র্যময় কাজ করতে হয়। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ অর্থহীন কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতির করুণ অবস্থার একাংশের জন্য দায়ী এসব কাজ। এ মহামারী বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, অনেক কাজের কোনও দরকার নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজে দক্ষ কর্মীর অভাব রয়েছে। যে সমাজে অর্থনীতির মূল নীতিমালা হচ্ছে বিনিময়মূল্য। যেখানে জীবনযাপনের মৌলিক প্রয়োজন বাজারেই পাওয়া যায় সেখানে মানুষ অর্থহীন কাজ করতে আকর্ষণ বোধ করে। কিন্তু ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের পর মানুষ এসব কাজ থেকে দূরে সরে আসবে। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে।

অর্থনৈতিক সংকট হবে দীর্ঘমেয়াদি: The Organisation for Economic Co-operation and Development (ওইসিডি)-এর প্রধান বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক বছর সময় লেগে যাবে। ওইসিডির মহাপরিচালক এঞ্জেল গুরিয়া বলেছেন, এ মহামারী থেকে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে তার চেয়ে বেশি বড় হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এর আকস্মিকতা।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বাড়বে :গবেষণার তথ্য বলছে সারা বিশ্বের সরকার প্রধানরা নানা ধরনের স্বল্পমেয়াদী জরুরি সিদ্ধান্ত নেবে। বড়সড় বিপর্যয় বা জরুরি অবস্থার চরিত্রই এরকম। ঐতিহাসিক সময় প্রক্রিয়াকে খুব দ্রুত ঘটিয়ে ফেলে। সাধারণ সময়ে আমাদের যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং বাস্তবায়নে লেগে যায় বছরের পর বছর বড়সড় বিপর্যয়ে তা হয় অসম্ভব দ্রুত।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাড়বে :বিপর্যয়ের সময় একটি দেশ হয়ে ওঠে বেশ বড় মাপে একটা সামাজিক নিরীক্ষার জায়গা। যেমন সবাই এখন বাড়িতে থেকে কাজ করছে। দূরত্ব মেনে যোগাযোগ বজায় রাখছে। আবার সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে চলছে। স্বাভাবিক সময় কোনো দেশের সরকারই এ ধরনের কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রাজি হত না। আবার ল্যাবে শিক্ষার্থী এবং বিজ্ঞানীরাও চালাছে নানা গবেষণা। স্বাভাবিক সময়ে হয়তো এর পরিমাণ এত বেশি হত না।

অভ্যাস থেকে যাবে: ক্রান্তিকাল পার করছি আমারা! ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে মেনে চলছি সামাজিক দূরত্ব। আচ্ছা এই দূরত্ব রেখে চলা কি আমাদের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে? করোনার এই ঝড় থামলেও এই অভ্যাস কি থেকে যাবে? গবেষকরা তো তেমনই বলছেন। প্রযুক্তিভিত্তিক যোগাযোগ যেমন বেড়েছে। তা নাকি থেকেই যাবে। তবে দরিদ্র এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলো অপ্রস্তুত এবং দুর্বল হয়ে পড়বে।

প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিতে পড়বে :সরকার ও কর্পোরেট ব্যবস্থা বড়সড় ধাক্কা খেতে চলেছে করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে। অনেক বড় সংস্থাগুলোও ধ্বসে পড়বে। বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে বিমান শিল্প, অফিস ভবন, শপিংমল, এয়ারলাইনস এবং বিমানবন্দরগুলো আছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।
প্রযুক্তি ব্যয় হ্রাস পাবে :বর্তমানে জৈব প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৃহত্তম বিনিয়োগ শুরু করার সুস্পষ্ট জায়গা। তবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রযুক্তিগত দিকে বড় বিনিয়োগ কমে যাবে।

স্বল্পমেয়াদি ত্যাগের লক্ষ্যে যোগাযোগ অর্জনের মতো দীর্ঘমেয়াদী অগ্রাধিকারগুলো থমকে যাবে।আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি পাবে।
এখানে আরো বিবেচনার বিষয় হলো, করোনার ফলে বিশ্বের শ্রমবাজারে কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। কিছু পেশার চাহিদা কিছুতেই করোনা-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে না বলে আমার অনুমান। বিশেষ করে যেগুলোয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না। যেমন রেস্টুরেন্ট বা ব্যায়ামাগারের ব্যবসা। এছাড়া কিছু পেশায় দরকার শারীরিক সংস্পর্শ, যেমন চুলকাটা। এছাড়া চাহিদা কমে যেতে পারে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে এমন কার্যক্রমের, যেমন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার। ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পেরও চাহিদা কমে যাবে অনুমান করি। এসব পেশার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের জীবন-জীবিকার জন্য অন্য পেশার অনুসন্ধান করতে হবে অথবা নতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানিয়ে নিতে হবে বাজারের চাহিদার সঙ্গে।

কোন এক দৈববলে সব কিছু আগের মত হয়ে যাবে। তবে পৌরাণিক কাহিনীতে দেবতার সাহায্য পেতে হলেও নিজেকে হারকিউলিস হতে হয়। হারকিউলিস কিন্তু বুদ্ধি ও শক্তিকে কাজে লাগিয়েছিল। হাইড্রার মাথা কেটেছিল তরবারি গরম করে, যাতে রিজেনারেটিং সেলগুলি পুড়ে গিয়ে আর মাথা না গজায় আর মেডুসাকে পাথর করেছিল আয়না দিয়ে, পিওর ফিজিক্স। দেবতার সাহায্য পেতে গেলেও বিজ্ঞান লাগে। বিজ্ঞানচিন্তা বাদ দিয়ে গায়ের জোরে কাজ হয় না। তাই আসুন, সম্মিলিতভাবে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা করোনা যুদ্ধে জয়ী হই। এ বিজয় হবে মানবতা ও মনুষ্যত্বের।

লেখক: এম এস হাবিবুর রহমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, নিউজ সমাহার। সিইও, জোনাকি মিডিয়া গ্রুপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *